হেমন্ত এলেই শুধু অবসর পাওয়া যায় ১



(প্রথম পর্ব)”

বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম ।


প্রচুর আলো বাতাস আর বিশাল একটা আকাশকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা আমার । কলেজে উঠার পর চলে আসতে হল ইট, পাথর, ধোঁয়া আর যান্ত্রিকতায় ভরা ঢাকা শহরে । হোস্টেলের রুমটা প্রথম দর্শনেই অপছন্দ করে ফেললাম । ভরদুপুরেও ঘোর অমবস্যার অন্ধকার । জানালা একটা আছে বটে তবে সেটা আলো বাতাস চলাচলের জন্য না; দুর্গন্ধ আর মশা প্রবেশের জন্য ।খাঁচায় রাখা পাখির মতো ছটফট করতো আমার প্রাণ। একটু পা ছড়িয়ে বসার জায়গা নেই,নেই দম ফেলার জায়গা।


কলেজের প্রেসারে রাত দিন এক করে পড়াশোনা করতে হত। তবু বিকেলবেলা কিছুটা হলেও অবসর পাওয়া যেত । কিচ্ছু করার ছিলনা তখন । বাতাসের মতো অবাধ ছিল আমার জীবন,মাঠে ঘাটে দৌড়ঝাঁপ করে বড় হয়েছি আমি, ইলেক্ট্রনিক্স গ্যাজেট আমাকে তেমন টানতো না, সারাদিন ক্লাসের পড়া পড়ার পর গল্পের বইটই পড়তেও ইচ্ছে করতোনা। রুমে মন খারাপ করে আমারই মতো আরেক হতভাগার সঙ্গে চুপ করে বসে থাকতাম । মাঝে মাঝে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতাম ।

উদ্দেশ্যহীন ভাবে।


রিকশার গোলকধাঁধ,লোকাল বাস, ফুটপাতের ফেরিওয়ালা,স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, অগণিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মানুষ, দীর্ঘশ্বাসের মতো হুইসেল দিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেন, হেমন্তের বিষন্ন আলো সব কিছু ছাপিয়ে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো ছোট্ট একটা নদীর পাড়, নদীর পাড়ের অলৌকিক একটা গ্রাম । 


একদল কিশোর সরিষাক্ষেতের আইল দিয়ে সারিবেঁধে হেঁটে যাচ্ছে । সরিষাক্ষেতের ওপর হেমন্তের নতুন কুয়াশা গা এলিয়ে দিয়েছে পরম আয়েশে । কিশোরদের কারো হাতে স্ট্যাম্প, কারো কাঁধে বল । সারাবিকেল মাঠে বল পিটিয়েছে ওরা । এখন যে যার বাড়ীতে ফিরে যাচ্ছে । অশত্থ গাছের ওপর দিয়ে পূর্ণিমার বিশাল চাঁদটা উঁকি দিতে শুরু করেছে । দূরের একটা গ্রাম থেকে করুন সুরে একটা বাছুর হাম্বা করে উঠলো । মাকে ডাকছে বোধহয় ওটা। উত্তরের বাতাসে সেই ডাক ভেসে বেড়ালো অনেকক্ষন । নিজের শহরের ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো দেখলে ইচ্ছে করতো সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এখনি চেপে বসি ট্রেনে ।



ঢাকা শহরের বাচ্চাদের দেখলে খুব কষ্ট হয়। কি করুণ অবস্থা ওদের! এমন এক সিস্টেম বানিয়ে ফেলেছি আমরা যেই সিস্টেম প্রত্যেকটা মুহূর্তে চুষে নিচ্ছে বাচ্চাদের জীবনীশক্তি । বইয়ের ভারে, কোচিং সেন্টারে এ দৌড়াদৌড়ি আর প্রাইভেট টিউটরের উৎপাতে ওদের জীবনটা কেরোসিন। ওদের ওপর এত চাপ দিয়ে কি লাভ?


 ওদের প্রতি একটু রহম করুন না । ওকে কেনইবা সব বিষয়ে ফুল মার্কস পেতে হবে? ওকে কেনইবা পাশের বাসার ফাইয়াজ বা ফারিহার মতো হতে হবে? আমরা প্রত্যেকেই না আলাদা আলাদা মানুষ ? 


আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদা একটা সত্তা আছে , আছে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট?

কেন আমরা অন্যের কার্বন কপি হতে চাই?

কেন?


অন্যের জীবনের দিকে না তাকিয়ে আমরা যদি আমাদের নিজেদের মতো করে জীবন যাপন করতে পারতাম তাহলে এই পৃথিবীটা অনেক বেশি সুন্দর হতো। এত টেনশান, এত অস্থিরতা,মানসিক অশান্তি, ইনসোমোনিয়া থাকতো না আমাদের। প্রত্যেকেই জীবনে যেটা হতে চেয়েছিল, যেটা ভালোবাসতো সেটাই হতে পারতো । ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে রোজ সকালে গোমড়া মুখে ব্যাংকের ডেস্কে বসতে হতো না, লুকিয়ে কবিতা লিখা ছেলেটাকে মনের বিরুদ্ধে পড়তে হতো না বিবিএ ।   


ঢাকা শহরের যান্ত্রিক হৃদয়হীন মানুষগুলো টাকা,ক্যারিয়ার আর খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে অখন্ড অবসর পায়না বললেই চলে। তারপরেও যতটুকু অবসর পায়,ততটুকু উপভোগ করাও বিশাল এক সমস্যা । কত দরিদ্র এই ঢাকা শহর! এক চিলতে আকাশ নেই , নিঃশ্বাস নেবার জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই, বাঁশঝাড় নেই ,নেই বাঁশঝাড়ের মাথার ওপরের সেই নির্ভেজাল চাঁদটাও ! এভাবে মুরগীর কুঠিতে, নয়টা-পাঁচটায় বাঁধা ছকে বেঁচে থাকাকে কি বেঁচে থাকা বলে ? এ জীবন তেলাপোকার জীবন! এ জীবন সরীসৃপের জীবন ! তবুও এই সাদাকালো জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে মানুষ লাল নীল সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখে । মা ভালোবাসে তাঁর সন্তানকে , স্ত্রী অপেক্ষা করে থাকে কখন ঘরে ফিরবে তার ভালোবাসার মানুষটা ।


কি লিখব ভেবে লিখা শুরু করেছিলাম আর অপ্রাসঙ্গিক কতো কি লিখে ফেললাম!


অনেকের ক্ষেত্রেই মাস্টারবেশন বা পর্ন আসক্তি তীব্র আকার ধারণ করে শুধুমাত্র অবসর সময়টাকে ঠিকভাবে কাজে না লাগানোর ফলে । এই লিখাতে ইনশা আল্লাহ্‌ চেষ্টা করা হবে শত সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও কীভাবে অবসরকে আনন্দময় করা যায় সে বিষয়ে আলোকপাত করার।


চলবে ইনশাআল্লাহ

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলঃ ক্লিক


Comments

Popular posts from this blog

নেশা যখন চটি গল্প পড়া

গাজিয়াতুল হিন্দ

হ্যামিলনের বাশিওয়ালা