কুদৃষ্টির ক্ষতি এবং পরিনাম
✿✿ দৃষ্টি সংযত রাখা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
০১। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র ইরশাদ:
غُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ
"তোমরা স্বীয় দৃষ্টি অবনত রাখো এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করো।"
হাফেয ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ লেখেন, 'দৃষ্টি জৈবিক তাড়নার মুখপাত্র ও প্রতিনিধি হয়ে থাকে। দৃষ্টির হেফাজত প্রকৃতপক্ষে জৈবিক তাড়না ও লজ্জাস্থানেরই হেফাজত। যে স্বীয় দৃষ্টিকে স্বাধীন ছেড়ে দিল সে যেন নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিল। দৃষ্টি ওই সমস্ত বিপর্যয়ের মূল যাতে মানুষ পতিত হয়।'
০২। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
النَّظْرَةُ سَهُمْ مِنْ سِهَامٍ إِبْلِيسَ
'দৃষ্টি ইবলিসের তিরসমূহের মধ্যে একটি বিষাক্ত তির।'
০৩। কোনো কোনো সালাফ থেকে বর্ণিত আছে:
النَّظَرُ سَهُمُ سُمِّ إِلَى الْقَلْبِ
"দৃষ্টি এমন এক তির যা অন্তরে বিষ ঢেলে দেয়।"
০৪। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
الْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ
'দু-চোখের জিনা হচ্ছে দৃষ্টিপাত।'
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি কোনো পরনারীর প্রতি কামাতুর দৃষ্টি দেয় সে অন্তর দিয়ে ওই নারীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পূর্ববর্তীগণ দৃষ্টিকে 'আসক্তির মুখপাত্র' অর্থাৎ প্রেমবাহী দূত বলে অভিহিত করেছেন।
জুলাইখা যদি হযরত ইউসুফ আ.-এর চেহারা না দেখত তাহলে জৈবিক তাড়নার কাছে পরাজিত হয়ে গুনাহের আহ্বান জানাত না। ক্ষণিকের জৈবিক অস্থিরতার কারণে তার মানহানিকর বক্তব্যের আলোচনা কুরআনে কারীমে উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। কেয়ামত পর্যন্ত এই লজ্জাজনক ঘটনা তার দিকে সম্বন্ধিত করা হবে।
আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, কুদৃষ্টির লাঞ্ছনা কতটা খারাপ এবং সুদূরপ্রসারী হয়।
✿✿ হঠাৎ পতিত দৃষ্টি মাফ
কখনো কখনো এমন হয় যে, পথে চলতে গিয়ে বা আসা-যাওয়ার সময় বেগানা নারী সামনে এসে যায়। তখন তার চেহারায় দৃষ্টি পড়ে যায়। এ অবস্থা সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন:
يَا عَلِيُّ، لَا تَتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأَوْلَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
'হে আলী, একবার (অনিচ্ছাকৃত) দৃষ্টি পড়ে যাবার পর দ্বিতীয়বার (ইচ্ছাকৃত) দেখো না। কেননা তোমার প্রথম (অনিচ্ছার) দৃষ্টি মাফ। কিন্তু দ্বিতীয় (ইচ্ছাকৃত) দৃষ্টি মাফ নয়।'
এ থেকে বোঝা যায় যে, প্রথমবারের অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যদি কখনো প্রথমবারই ইচ্ছাকৃত দেখা হয় তাহলে তা হারাম হবে। প্রথম দেখা মাফ হওয়ার উদ্দেশ্য এই নয় যে, প্রথমবারই এতটা মন ভরে দেখে নেবে, যাতে দ্বিতীয়বার দেখার প্রয়োজনই হবে না। শুধু এটুকু ছাড় দেয়া হয়েছে যে, কখনো যদি হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যায় তাহলে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নেবে।
হযরত জারির ইবনু আব্দুল্লাহ আল-বাজালী রাযি. বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চাইলাম, যদি হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যায় তবে তার কী হুকুম? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
اصْرِفْ بَصَرَكَ
'তুমি স্বীয় দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও।'
কখনো কখনো বিচারক, ডাক্তার বা জজের শরয়ী কারণে বেগানা নারীর চেহারা দেখতে হয়। এ সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরিমাণ দেখার পর দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে।
✿✿ কুদৃষ্টি অনিষ্টের মূল
পরনারীর দিকে কামাতুর দৃষ্টিতে দেখা অনিষ্টের মূল। শয়তান বেগানা নারীর চেহারা আকর্ষণীয় করে পেশ করে। তাছাড়া দূর থেকে সব জিনিসই ভালো দেখায়। এ জন্যই তো প্রসিদ্ধ প্রবাদ রয়েছে, 'দূরের ঢোলের আওয়াজ সহনীয় হয়ে থাকে'। কুদৃষ্টির ফলে অন্তরে গুনাহের আবরণ পড়ে যায়। সময়-সুযোগ বুঝে তা তার রং প্রকাশ করে। কাবিল হাবিলের স্ত্রীর সৌন্দর্যে দৃষ্টি দেয়ার কারণেই তার মন ও মস্তিষ্কে এমন 'ভূত' চাপল যে, সে তার নিজ ভাইকেই হত্যা করে ফেলল। দুনিয়াতে সেই সর্বপ্রথম অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়।
কুরআন মাজীদে তার এহেন মন্দ কাজের আলোচনা উঠে এসেছে। কেয়ামত পর্যন্ত যত হত্যার গুনাহ হবে তার একটা অংশ তার ওপর আসতে থাকবে। বোঝা গেল প্রথম দৃষ্টি দেয়া না দেয়া তো নিজের ইচ্ছাধীন। কিন্তু দৃষ্টি দেয়ার পরের পরিস্থিতি ইচ্ছার বাইরে চলে যায়।
چلے کہ ایک نظر تیری بزم دیکھ آئے
یہا جو آئے تو بے اختیار بیٹھ گئے
'চলো তোমার মেলা দেখে আসি এক পলক এখানে যে আসে অজান্তেই বসে থাকে অপলক।'
এ জন্যই উত্তম হচ্ছে প্রথমবার দেখা থেকেই বেঁচে থাকবে। আশঙ্কায় ফেঁসে যাওয়া সচেতন লোকদের কাজ নয়।
✿✿ কুদৃষ্টি ব্যভিচারের প্রথম ধাপ
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
'চোখের জিনা দেখা। কানের জিনা শ্রবণ করা। জবানের জিনা বলা। হাতের জিনা ধরা। পায়ের জিনা চলা। আর অন্তর ঝুঁকে যায় এবং প্রত্যাশা করে। অতঃপর লজ্জাস্থান তা সত্যায়ন বা প্রত্যাখ্যান করে।
ইমাম গাযালী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, দৃষ্টি সংশয় সৃষ্টি করে। সংশয় চিন্তাকে জাগ্রত করে। চিন্তা জৈবিক কামনাকে উদ্বেলিত করে। আর জৈবিক কামনা ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করে।
এ থেকে বোঝা যায় যে, ব্যভিচারের আগ্রহ মানুষের মাঝে তখন জাগে যখন সে পরনারীর দিকে দেখে। যদি না-ই দেখে তাহলে আগ্রহই সৃষ্টি হবে না। বোঝা গেল, কুদৃষ্টি ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। প্রসিদ্ধ একটি দৃষ্টান্ত এমন, 'দুনিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘতম সফরের সূচনা এক কদম উঠানো থেকেই শুরু হয়ে যায়।' অনুরূপভাবে ব্যভিচারের সূচনাও কুদৃষ্টি দ্বারাই হয়ে যায়। মুমিনদের উচিত হবে তারা প্রথম ধাপে পা রাখা থেকেই বিরত থাকবে।
✿✿ কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকায় ঈমানের স্বাদ লাভ
মুসনাদে আহমাদে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র ইরশাদ বর্ণিত হয়েছে:
'কোনো মুসলিম যখন প্রথমবার কোনো নারীর সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি পড়ার পর স্বীয় দৃষ্টি নত করে নেয়, আল্লাহ তাআলা তার ইবাদতে স্বাদ দান করেন।
তাবারানী শরীফে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে:
'যে আমার ভয়ে কুদৃষ্টি পরিহার করে আমি তাকে এমন ঈমান দান করি যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করে।'
কতই-না লাভজনক সওদা! কুদৃষ্টির অস্থায়ী ও কৃত্রিম স্বাদ পরিহারে ঈমানের স্থায়ী মিষ্টতা ও স্বাদ লাভ হয়। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তির অন্তরে প্রশান্তি ঢেলে দেবেন। তা ছাড়া নিয়মও এটাই যে, আমলের প্রতিদান অনুরূপ জিনিস দিয়েই দেয়া হয়। সুতরাং যে পরনারীকে দেখার স্বাদ বর্জন করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ইবাদত ও ঈমানের পরম স্বাদ দান করবেন।
✿✿ কুদৃষ্টি দ্বারা কখনো তৃপ্তি লাভ হয় না
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, কুদৃষ্টি যত বেশি পরিমাণেই করা হোক, এমনকি যদি হাজার হাজার নারী পুরুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়েও দেখা হয়, তবুও তাতে তৃপ্তি লাভ হবে না।
কুদৃষ্টি এমন পিপাসার জন্ম দেয় যা কখনো নিবারণ করা যায় না। পানিশূন্যতার রোগীকে যত পানিই পান করানো হোক, যদি তার পেট ফেটে যাবারও উপক্রম হয়, তবুও তার পিপাসা দূর হয় না। আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজন থেকে অধিক সৌন্দর্য দান করেছেন। মানুষ যত বড় সুন্দরীকেই দেখুক না কেন, একজনকে দেখবে তো আরেকজনকে দেখার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এটি এমন এক সমুদ্র, সারা জীবন সাঁতার কেটেও যার তীরে পৌঁছা সম্ভব নয়। কেননা এটি হচ্ছে কূলহীন দরিয়া।
✿✿ কুদৃষ্টি ক্ষতকে গাঢ় করে
কুদৃষ্টির তির যখন বিদ্ধ হয়ে যায় তখন অন্তরের ব্যথা শুধু বাড়তেই থাকে। কুদৃষ্টি যত বেশি করা হয় এই ক্ষতও ততই গাঢ় হয়। হাফেয ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, দৃষ্টির তির নিক্ষেপের পর নিক্ষেপকারী প্রথমে আহত হয়। কেননা দৃষ্টি নিক্ষেপকারী দ্বিতীয় দৃষ্টিকে তার ক্ষতের মলম মনে করে। অথচ তা ক্ষতের গভীরতাকেই বাড়িয়ে দেয়।
لوگ کانٹوں سے بچ کے چلتے ہے
ہم نے پھولوں سے زخم کھائے ہیں
'মানুষ কাঁটা থেকে বেঁচে চলে
আর আমাকে আহত করেছে ফুলে।'
হাফেয ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
"দৃষ্টি অবনত রাখা সহজ। কিন্তু দৃষ্টি দেয়ার পর তার যাতনা সহ্য করা কঠিন।"
✿✿ বৃদ্ধরাও কুদৃষ্টি থেকে নিরাপদ নয়
সরাসরি ব্যভিচার করা থেকে অনেকেই বেঁচে যায়। কেননা এর জন্য অনেক কসরত করতে হয়। প্রথমত, যার সাথে জিনা করবে তাকে রাজি হতে হবে। দ্বিতীয়ত, যথাযথ সুযোগ ও সহায়ক স্থান পেতে হবে। তৃতীয়ত, নির্জন পরিবেশ লাগবে। তা না হলে কেউ দেখে ফেলার ভয় থাকে। দেখে ফেললে তো মানসম্মান মাটিতে মিশে যাবে। এ জন্য শালীন ও ভদ্রলোকেরা তাতে কম লিপ্ত হয়। আর যদি পতিতালয়ের নারীদের সাথে জিনা করতে চায় তাহলে পানির মতো টাকাপয়সা খরচ করতে হয়। তা ছাড়া এইডস, সিফিলিস, সাইকোসিস ইত্যাদি নানা রকমের জটিল জটিল যৌনরোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু কুদৃষ্টির গুনাহ এর ব্যতিক্রম। এতে কোনো উপকরণের প্রয়োজন পড়ে না। আর এতে মানহানিরও কোনো ভয় থাকে না। কেননা এ বিষয়টি তো কেবল আল্লাহ তাআলা জানেন যে, তার মনের কী ইচ্ছা। ওই বৃদ্ধ, যে বাহ্যত সহবাস করতে সক্ষম নয়, সেও কুদৃষ্টির গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়; বরং তার মাঝে গুনাহের আফসোস কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। কবি বলেন-
جوانی سے زیادہ وہ وقت پیری جوش ہوتا ہے .... بھڑکتا ہے چراغ صبح جب خاموش ہوتا ہے
'যৌবনের তুলনায় বার্ধক্যে কামস্পৃহা যায় বেড়ে প্রভাত যখন থেমে যায় প্রদীপ উঠে জ্বলে।'
কিছু লোক আছে যাদের শরীর বৃদ্ধ হয়, কিন্তু মন যুবকই থাকে। তারা সব সময় স্বীয় যৌবনের কথা স্মরণ করতে থাকে।
پیری تمام ذکر جوانی میں کٹ گئی
کیا رات تھی کہ ایک کہانی میں کٹ گئی
যৌবনের স্মরণেই কেটে গেল বার্ধক্য সবটা কী ছিল, এক কাহিনিতেই কেটে গেল সে রাতটা।
অনেকেই আছে পা কবরে চলে গেছে। কোমর ঝুঁকে গেছে, তারপরও যৌবনের সন্ধান করে। কবি বলেন-
یہیں کہیں تھی جوانی مگر پتہ نہ چلا
اس کو ڈھونڈ رہا ہوں کمر جھوکائے ہوئے
'এখানেই কোথাও যৌবন ছিল মিলেনি তার খোঁজ তাকেই খুঁজে ফিরছে সদা কোমর করে কুঁজ।'
চিন্তার বিষয় হচ্ছে, যৌবন যদি উদাসীনতায় কেটে যায়, তাহলে বার্ধক্যে তো অন্তত আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকা উচিত। কিন্তু এখানে তো উল্টো স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে:
عہد پیری میں جوانی کی امنگ
آہ کسی وقت میں کیا یاد آیا
'বার্ধক্যে যৌবনের জোশ এলো
আহ, কখন কী স্মরণ হলো!'
তামাশার একটি দিক এটিও যে, নারীরা বৃদ্ধ মনে করে তার সাথে পর্দা করায় গুরুত্ব দেয় না। এতে কুদৃষ্টির গুনাহ আরও সহজতর হয়ে যায়। এমন কামাসক্ত বৃদ্ধের চুল তো সাদা হতে থাকে, কিন্তু অন্তর হতে থাকে কালো। হাশরের দিন যুগের ভাষায় বলা হবে:
ناکردہ گناہوں کی بھی حسرت کی ملے داد
یا رب! اگر ان کردہ گناہوں کی سزا ہے
'না করা পাপের আফসোসও আজ বিচারের কারণ! হে আল্লাহ! শাস্তি হতো যদি শুধু কৃত পাপেরই দরুন।'
হযরত থানবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এক বৃদ্ধ লোক আমার কাছে আসত, যে অনেক বিষয়েই পরহেজ করে চলত। কিন্তু সে নিজের অবস্থা বর্ণনা করে বলল যে, সে পরনারীর দিকে কামাতুর দৃষ্টি দেয়ার গুনাহে লিপ্ত। কুদৃষ্টির কুফল কতটা ভয়াবহ যে, বৃদ্ধ ব্যক্তি কবরের কিনারায় পৌঁছে যায়, কিন্তু কামনার রোগ তার সাথে সাথেই লেগে থাকে।
✿✿ কুদৃষ্টির দরুন আমলের তাওফীক ছিনিয়ে নেয়া হয়
শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহ. বলেন, কুদৃষ্টি বড়ই বিধ্বংসী রোগ। আমার অনেক পরিচিতজনদের ওপর এর একটি অভিজ্ঞতা আমারও আছে। যিকিরে মনোনিবেশের ফলে শুরুতে স্বাদলাভ ও জোশের একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়। কিন্তু কুদৃষ্টির কারণে ইবাদতের মিষ্টতা ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে তা ইবাদত ছুটতে থাকারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো সুস্থ যুবকের জ্বর আসে এবং তা ভালো হবার নামও না নেয়, তাহলে কমজোরি ও দুর্বলতার কারণে তার চলাফেরা করাই কষ্টকর হয়ে যায়। কোনো কাজই করতে ইচ্ছা হয় না। শুধু বিছানায় পড়ে থাকতে মন চায়। এমনইভাবে যে ব্যক্তি কুদৃষ্টির রোগে আক্রান্ত হয়, সে আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। নেক কাজ করা তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। অন্যভাবে বললে, তার থেকে আমলের তাওফীক ছিনিয়ে নেয়া হয়। নেক কাজ করার নিয়তও সে করে; কিন্তু কুদৃষ্টির কারণে নিয়ত ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়। কবি বলেন:
تیار تھے نماز کو ہم سن کے ذکر حور
جلوہ بتوں کا دیکھ کر نیت بدل گئی
'নামাযের জন্য তৈরি ছিলাম হুরের কথা শুনে নিয়তখানা বদলে গেল (নারীর) ছায়ামূর্তি দেখে।'
✿✿ কুদৃষ্টির দ্বারা স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়
হযরত মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. বলতেন, পরনারী এবং নাবালেগ শিশুদের কামভাবের সাথে দেখার ফলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এ দাবির স্বপক্ষে এই প্রমাণই যথেষ্ট যে, কুদৃষ্টিতে অভ্যস্ত হাফেযদের কুরআন মুখস্থ থাকে না। আর যারা কুরআন হিফজ করছে তাদের দৈনন্দিন সবক আয়ত্ত করা মুশকিল হয়ে পড়ে। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর উস্তাদ ইমাম ওকী রহ.-কে স্মৃতিশক্তি দুর্বলতার অভিযোগ করলে তিনি তাকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপদেশ দেন। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ উস্তাদের তার সাথে সেই কথোপকথনকে কবিতাকারে বর্ণনা করেছেন:
شَكَوْتُ إِلَى وَكِيعٍ سُوءَ حِفْظِي
فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْكِ الْمَعاصِي
وَأَخْبَرَنِي بِأَنَّ الْعِلْمَ نُورٌ
وَنُورُ اللهِ لَا يُهْدَى لِعَاصِي
"উস্তাদ ওয়াকীর দরবারে শুধালামছ পেয়েছে ভুলোমন ব্যাধি
শুধালেন তিনি, ছেড়ে দাও গুনাহ, মেনে নাও রবের বিধি।
মনে রেখো বাছা, দ্বীনের এ ইলম রবের বিশেষ নূর,
পাপী তাপী তাতে ঋদ্ধ হবে, সে আশা বহুদূর।"
মাদরাসা ও কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এতে বড় শিক্ষা রয়েছে।
✿✿ কুদৃষ্টি লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার কারণ
শায়খ ওয়াসেতী রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আল্লাহ তাআলা যখন কাউকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে চান তখন তাকে চেহারার সৌন্দর্যে অবৈধ দৃষ্টি দেয়ায় অভ্যস্ত করে দেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, কুদৃষ্টি লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার মৌলিক কারণ।
যে সকল সৌভাগ্যবান লোকেরা নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখতে সক্ষম হয়, তারা বড় ধরনের বিপদ-আপদ থেকে বেঁচে যায়।
মীর তাকী মীর বলেন:
اس عاشقی میں عزت سادات بھی گئی
এই উন্মাদনায় সম্মান, বংশীয় মর্যাদা সবই গেল।
মীর্যা গালিব এক কবিতায় বলেন:
عشق نی غالب نکما کر دیا ... ورنہ ہم بھی آدمی تھے کام کی
'প্রেমাসক্তি অপদার্থ করে দিয়েছে গালিবকে নইলে কাজের লোক ছিলাম আমরাও সব দিক থেকে।'
✿✿ কুদৃষ্টির প্রভাবে বরকত নষ্ট হয়ে যায়
কুদৃষ্টির কুফলগুলোর মধ্যে এটিও একটি যে, কুদৃষ্টির কারণে মানুষের রিযিক এবং সময় থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়া হয়। ছোট ছোট কাজ বিশদাকার ধারণ করে। যে কাজের চেষ্টাই করুক তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাহ্যিকভাবে মনে হয় কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু যথাসময়ে গিয়ে হতে হতে কাজ অসম্পন্ন থেকে যায়। এতে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী বাড়ে। মানুষেরা মনে করে, কেউ হয়তো (জাদুটাদু) কিছু করেছে। আসলে সে স্বীয় প্রবৃত্তির কুকর্মের কারণে বিপদে পড়ে গেছে। সে নিজেই তা স্বীকার করে বলে, 'একটা সময় ছিল যখন স্পর্শ করলে মাটিও সোনায় পরিণত হতো। আর এখন তো সোনা স্পর্শ করলেও তা মাটি হয়ে যাচ্ছে।' বোঝা গেল, কুদৃষ্টির প্রভাবে মানুষের জীবন থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়া হয়।
✿✿ কুদৃষ্টি দেয় এমন ব্যক্তির ব্যাপারে শয়তানের বড় আশা
এক বুযুর্গের শয়তানের সাথে কথা হলে তিনি অভিশপ্ত শয়তানকে জিজ্ঞাসা করলেন, এমন ক্ষতিকর কোনো আমলের কথা বলো যার কারণে মানুষ সহজেই তোমার ফাঁদে ফেঁসে যায়। বিতাড়িত শয়তান উত্তর দিল, পরনারীর প্রতি কামনার দৃষ্টিতে দেখা এমন যে, আমি ওই ব্যক্তির ব্যাপারে বড়ই আশাবাদী, কখনো না কখনো তাকে আমি গুনাহে লিপ্ত করে আমার জালে বন্দী করেই নেব। যারা দৃষ্টি নত রাখে আমার অনেক আক্রমণই তাদের ওপর কার্যকরী হতে পারে না। আমি চতুর্দিক থেকে মানুষকে বিপথগামী করার কসম খেয়েছি। কিন্তু নিচের দিকটি নিরাপদ। যে দৃষ্টি অবনত রাখে সে আমাকে নিরাশ করে দেয়।
✿✿ কুদৃষ্টির ফলে নেকীর বরবাদি ও গুনাহ অবশ্যম্ভাবী
পরনারীর প্রতি লালসার দৃষ্টি দানকারী ব্যক্তি দ্রুত হোক বা দেরিতে, সাধারণত সে প্রেমরোগে আক্রান্ত হয়েই যায়। সে সৃষ্টিকে নিজের প্রেমাস্পদ বানিয়ে নেয়। কোনো ব্যক্তি বলেছেন-
تو میرا دین ایمان سجنا
'ওগো প্রেয়সী আমার জান! তুমিই আমার দ্বীন, ধর্ম, তুমিই আমার ঈমান।'
একে ছোট শিরক বলা হয়। শিরক এমন গুনাহ যা কৃত আমল ধ্বংসের কারণ হয়। আর একেই বলে 'নেকীর বরবাদি গুনাহ অবশ্যম্ভাবী।'

Comments
Post a Comment